বয়স আমার কত
#পনেরো_বছর_আগে_অথবা_পরে
[উচ্চশিক্ষিত বেকারদের আত্মকথা]
অপরাজিত (ড. বাবুল মণ্ডল)
এক অদ্ভুত সময়ে জন্ম আমাদের,
এক অদ্ভুত হাহাকারের জীবন !
শুধু হারতে হারতে হারিয়ে যাওয়া—
প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে !
শুধুই শূন্যতা—, দুই হাত খালি—!
বয়স বেড়ে যায়, ধৈর্য্যের বাঁধ যায় ভেঙে !
জীবনের প্রতিষ্ঠা তবু পায় না পরিণতি!
অথচ—
আমরা যদি পনেরো বছর আগে জন্মাতাম।
অথবা পনেরো বছর পরে—
জীবন আর জীবনচর্যা অন্যরকম হতো।
চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে মিল থাকতো অনেকখানি।
যদি আমরা পনেরো বছর আগে জন্মাতাম—
হয়তো গ্র্যাজুয়েটে মাত্র পঞ্চাশ পার্সেন্ট নম্বর নিয়েও
প্রতি বছর বিএড ছাড়াই চাকরির পরীক্ষায়—
নিয়মিত পারতাম বসতে।
অথবা পেতাম কোনো স্কুলের শিক্ষকতার পদ।
কষ্ট করে পড়ার যোগ্য দাম পেতাম হাতে হাতে—
ট্রেনিং ছাড়াই অথবা ট্রেনিং-এর
একবছরের মাথাতেই জুটতো কাজ।
আজ সেসব স্বপ্ন যে !
এই পনেরো বছর সবকিছুকেই—
উলোটপালোট করে দিল আমাদের !
পাল্টে দিল পড়তে পড়তে তৈরি করা—
ভবিষ্যতের যা কিছু সব হিসাবনিকেশ !
মনের মাঝে তৈরি হওয়া যা কিছু সব স্বপ্ন, আশা—
কোনো ভরসা পাই না মনে !
আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ? নিরাপদ জীবন ?
চাকরির পরীক্ষা হবে কি ?
প্রশ্নপত্র চুরি যাবে নাতো আগেই ?
রেজাল্ট বের হবে তার ?
কিংবা রেজাল্টে শুধু যোগ্য—মেধাবীদেরই নাম থাকবে তো ?
হাইকোর্টে মামলা ঝুলে যাবে না তো আবার—
আগেরগুলোর মতোই ?
নিয়োগ হবে কি শেষপর্যন্ত ?
সেখানে ঠাঁই হবে তো আমার ?
কোনো রাজনীতি কিংবা উৎকোচ ছাড়াই ?
জানি না এইসব প্রশ্নের উত্তরের নিশ্চয়তা কত পার্সেন্ট !
কিন্তু—
যদি আমরা পনেরো আগে জন্মাতাম—
আজ আমি কোনো অফিসের হেডক্লার্ক হতাম।
নির্দ্ধিধায় আর কয়েক বছর পরেই হতে পারতাম
কোনো কলেজের প্রিন্সিপ্যাল—
কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগের প্রধান !
এম এ, নেট দিয়েই পেতে পারতাম কলেজ—
বিশ্ববিদ্যালয়ের আপয়নমেন্ট লেটার।
অথচ আজ আমি বেকার—
আমি এমএ, বিএড, নেট, জেআরএফ, পিএইচ ডি !
আর—
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
জীবন আর জীবনচর্চা অন্যরকম হতো,
চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে মিল থাকত অনেক।
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
আমাদের খালিপায়ে স্কুল যেতে হতো না,
ধুলো কাদা, তাপ এড়িয়ে জুতো পরে যেতাম স্কুলে।
আমাদের পায়ে হেঁটে তিন-চার কিমি দূরে—
স্কুল যেতে হতো না।
যেতাম সবুজ সাথীর সাইকেলে চড়ে।
স্কুলকে পেতাম সামনেই, বাড়ির কাছেই।
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
স্কুলে গিয়ে খালি মেঝেতে অথবা
নিজেদের নিয়ে যাওয়া চটের বস্তার উপর
বসতে হতো না ঠাণ্ডায় আমাদের !
আর ধুলো মেখে স্কুলের ক্লাসরুম
পরিস্কার করতে হতো না নিজেদেরই দল বেঁধে !
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
সারাদিন স্কুলে আমাদের খালি পেটে থাকতে হতো না!
ক্লাসের মাঝেই পেতাম টাটকা থালা ভর্তি গরম ভাত !
সপ্তাহে পেতাম ডিম সোয়াবিন, ডাল—
মাসে থাকত চিকেনের পিস।
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
চটের বস্তার ব্যাগ নিয়ে স্কুল যেতে হতো না আমাদের।
স্কুল থেকেই পেতাম নতুন স্কুলের ব্যাগ।
স্কুলে গিয়ে ‘স্যার বই কেনা হয়নি বাবা বলেছেন
ধান বিক্রি হলেই কিনে দেবেন নতুন বই’
একথা বলে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না স্কুলের বেঞ্চে !
প্রতিবছর পেতাম নতুন রঙিন-ছবির বই !
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
তাহলে মেয়ে হিসাবে পেতাম কন্যাশ্রী,
স্কলারশিপের টাকা।
যা দিয়ে অনায়াসেই প্রাইভেট টিউটরের
মাসিক মাইনে পারতাম দিতে অনেকখানি।
বাবার ধান বেচার অপেক্ষা করতে হতো না আমাদের।
অথবা মাকে করতো হতো না—
গরুর দুধ, হাঁস মুরগির ডিম বিক্রি !
জীবন আর জীবনচর্চা অন্যরকম হতো আমাদের।
যদি আমরা পনেরো বছর পরে জন্মাতাম—
আমাদের থাকতো না ভয় পাশফেলের !
অনায়াসেই প্রতিবছর উঠে যেতাম নতুন শ্রেণিতে।
স্কুলে গিয়ে স্যার-ম্যামদের হাতে বেত খাওয়া
কিংবা চোখরাঙানির ভয় থাকতো না মোটেই !
বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না আমাদের—
পড়া না পারার জন্য অথবা দুদিন না আসার জন্য স্কুলে।
অনায়াসেই প্রবেশাধিকার থাকতো স্কুলে
দু’দিন বা দু’মাস স্কুলে অনুপস্থিত হয়েও।
জামা দেওয়া হতো প্রতি বছর ডবল ডবল !
কিন্তু হায় !
পনেরো বছরের ব্যাপ্ত একটা জেনারেশন
প্রায় শেষ হয়ে গেল !
আমরা এই পনেরো বছরের মাঝে পড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে শেষ !
অবসান হলো একটা যুগের !
এর শেষ কোথায় কেউ জানো ?
আমরা কেউ ডান, বাম, রাম, শ্যামপন্থী নই।
আমরা কর্মপন্থী—
যারা কাজ চেয়েছিলাম—চাই—
যারা দয়া-দাক্ষিণ্য কিংবা প্রতিশ্রুতি নয়,
হাতে হাতে আপয়নমেন্ট চেয়েছিলাম—চাই।
যারা চাই—প্রতিবছর চাকরির পরীক্ষা,
চাই স্বচ্ছতা—
আর চাই শুধুমাত্র যোগ্য-মেধাবীদের
যোগ্য পদে হোক নিয়োগ।
আমরা কেউ ডান, বাম, রাম, শ্যামপন্থী নই।
আমরা কর্মপন্থী—
যারা কাজ চেয়েছিলাম—চাই—
চাই আমাদের এত পরিশ্রমের দাম।
খালি পায়ে হেঁটে স্কুল যাওয়ার—
পরের বই ধার করে চেয়ে পড়ার,
ছেঁড়া জামা পরে, পরের বই রাত জেগে পড়ার।
কিন্তু সাহস পাই কই মনে !
আর ভরসা ?
আত্মবিশ্বাসের অভাব তো আপনারাই এনে দিয়েছেন—
আমাদের মনের মনিকোঠায় !
ফিরিয়ে দিতে পারবেন কী সেই আত্মবিশ্বাস ?
আশায় আছি।
কিন্তু এদিকে যে বয়স প্রায় ছুঁই ছুঁই—
চল্লিশের গেড়ো লেগে যাবে যে আর কদিন পরেই !
আর কী আশা আছে ?
এমন করেই চাষা এখনো রোজই বাঁচে—স্বপ্ন দেখে—
স্বপ্ন আঁকে মনে প্রাণে আর সংশয় একদিন কি আসবে সাফল্যময় দিন!
-----রাইসুদ্দিন খাঁন, কেশপুর , ০৮-১২-২০২১
Comments
Post a Comment